Friday, July 20, 2018

সঞ্জীব দে

রক্তপথ

খচ্চর ইজ্জত লুটে সাংঘাতিক দৌড়াচ্ছে
রক্তাক্ত বিবেক-পথ!
সকাল শিউলি নিস্পলক চোখে শায়িত
মধুছড়ার বুকে।
আমি এক টুকরো আগুন পেঁচিয়ে রেখেছি
গঙ্গার আঁচলে ,,
অগ্নোৎপাতের মুখ কবেই আটকে দিয়েছে রাষ্ট্র!
এখন সবাই রুমাল -নাকে ধর্ষিতা অন্ধ কামিনির মতো হেঁটে যায় মধু ছড়ার নড়বড়ে সাঁকো!

ইন্দ্রানী চাকলাদার

মেয়ে

ও মেয়ে !! তুই কেমন আছিস?
বলবি জানি - ভালো !
মিথ্যে বলার স্বভাব যে তোর
স্বভাবখানা ছাড়ো।

ও মেয়ে! তুই স্বপ্ন দেখিস?
না বাপু! মেয়েদের আবার স্বপ্ন কি গো?
চার দেওয়ালের মধ্যে থাকি।

ও মেয়ে! তুই হাসতে জানিস ?
হ্যাঁ জানি! নিজের উপর খুব হাসি,
অন্য লোকে হাসে আমার উপর।

ও মেয়ে! তুই কাঁদতে জানিস ?
সে কি গো! মেয়ে মানেই তো কান্না।
কান্না আমিও খুব ভালো পারি।

ও মেয়ে ! তুই ভালোবেসেছিস কখনও?
হ্যাঁ ! মেয়েরা খুব সহজেই ভালোবাসতে জানে,
আর তার বদলে পায় শুধু অবহেলা ।

সুব্রত সূত্রধর

কৃষকের আর্তনাদ

শুরু হলো কৃষকদের আর্তনাদ ।
বেজে উঠল এক কঙ্কালসার  জীবনের অবিচ্ছেদ্য দুঃখ  ।
উঠে এলো দুঃখময় জীবনের স্বপ্নাহত সুর ।
রসিকতা করার জন্য এক রজনীও থাকে না  রসালো কৃষকের কাছে ।
হঠাৎ চাপা পড়া সুখপাঠ্য যেন মধ্যরাতেই এক ফালি রোদ নিয়ে আসে দু-চারটি বিদ্যুৎ রশ্মি  ।
অগোছালো কৃষক জীবনের মতো মেঘও নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ বর্ণ ধারণ করে  ।
মেঘেরা আজ শুকনো কৃষকের প্রেয়সী হয়ে ভালোবাসা এগিয়ে দিচ্ছে নিকোটিন স্বপ্নের টুকরোর ন্যায়  ।
এভারেস্ট থেকে ভারত মহাসাগর যেন স্বপ্ন আর বাস্তবতার নিরিখে এক টানাপোড়েন দড়ি  ।
বাস্তবতা আজ স্বপ্ন নিয়ে খেলা করছে , স্বপ্ন খেলা করছে সুখ নিয়ে ।
উপকরণ স্বরূপ দুঃখ শেষে
কৃষকদের অশ্রুধারায় ভেসেই চলেছে  ।।

পার্থ ঘোষ

ত্রাণ

এখানে ধুলি ঝড় নেই,বন্যা আছে
অফুরন্ত জল, ঘোলা পানি
কতটা ভেসে গেলে গ্রাম,শহর,
আধা মফস্বল - সেনা নামে?

বিপদসীমা লঙ্ঘন করেছে চেতনা,
মানুষ তবুতো শ্বাপদের ন্যায় ঘোরে
কোন সীমা সে- মেনেছে কবে?

বানভাসি আমাদের বোধ, জাগরী অহর্নিশ।

সেনা আসে, সেনা যায়, গ্রাম ও শহর,
আধা মফস্বল - আজও ত্রাণ চায় কেবল।

ড. উমাশঙ্কর রায়

জীবন থেকে ধার নেওয়া


ইস্ - স্বপ্নগুলোর কোনো জাত নেই ! কিন্তু বে-জাত বলি কী করে ! কেননা জাতের দেশে, জাতের ব্যবসায়, তাদের যে রমরমা ! দারুণ চাহিদা !

তাছাড়া ইদানীং হাইব্রিড স্বপ্নগুলো ফলছেও ভালো। তাতে ইচ্ছায় হোক, আর অনিচ্ছায় হোক, স্বপ্নগুলো নানাবিধ ঝোলায় ঢুকে পড়ছে টপাটপ। ওরাই এখন সামগ্রী। বিকোতে হবে তাই।লেনদেন হলে পরে- ওরা চোখে বাসা বাঁধবে।তারপর চোখ যখন ঢলে পড়বে নিদ্রায় - তখন ওরা স্বাধীন হবে ! আহা! স্বপ্ন স্বাধীন হবে তখন !

কিন্তু সমস্যা যে অন্য জায়গায়।স্বপ্নগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রপ্তানী হয় ঐ নেইয়ের দেশে ! নেই বাজারে ! তাই কাড়াকাড়ি। ঠেলাঠেলি।মারামারি।সেই সুযোগে ঢুকে পড়ে ওরা আমজনতার চোখে।যাদের নেই- তাদের মনে। তাদের চোখেই ওদের ঠাঁই হয়ে যায় পাকাপাকি !

এমনটা হলেও খারাপ ছিল না।স্বপ্নে স্বপ্নেই ভরে যেত দেশটা।ভেসে যেত ওরা।নৌকো বিহার হতো দিব্যি ! তা-ও যে হচ্ছে না।শুধু একটি মিথ্যে কথা। মানে, যাদের কিছু নেই - তাদের দিকে কেউ তাকায় না।একেবারেই ভুল।বরং যাদের আছে - তারা সবসময়ই তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে - যাদের নেই। সেই তাকানো সোজাসুজি নয় অবশ্যই। তারা সবসময়ই তাকায় নীচের দিকে। ঈগলের মতো।তাতে ঐ সাম্রাজ্যের স্বপ্ন পাখীরা উড়তে গিয়ে ভয়ে মরে।ডানা মেলতে পারে না যথেচ্ছ।গাইতে পারে না আনন্দে।

আসলে নেই সাম্রাজ্যের স্বপ্নেরা ডানা মেললেই ঘটে - বিপত্তি। ওদের যে আছে এক নিয়তি ! ওরা যে শুধু থাকবে সযত্নে খাঁচায় বন্দী ! নানা রঙের - নানা মাপের খাঁচায় !

এই সভ্যতায় স্বপ্নগুলো যে আর লালিত হয় না ।পালিত হয় বটে ! বিভিন্ন কায়দায়। বিভিন্ন ভাষায়।দেখার বিষয় এই - সেই কায়দাটা কার ।

Thursday, July 19, 2018

ড. সোনালী রায় বাগচী

তমসা

এক অদ্ভুত সময় এখন ।
মনুষ্যত্বের শরীর থেকে হিংস্র শেয়াল কুকুর
প্রতিদিন খুবলে নিচ্ছে নরম মাংস ।
পৈশাচিক উল্লাসে আয়োজন চলছে
নরমেধ যজ্ঞের ।
ধুলো ওঠা পাথুরে জমির বাঁজা বুক
শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে
যুবতীর অনাবৃত , লাঞ্ছিত স্তনের মতো ।
বেপরোয়া শুক্রকীট বাসা বেঁধে চলেছে
কোনো অজানা গ্রহের অন্ধকার জরায়ুর মাঝে ।
চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে
এক অজানা যুদ্ধের সুতীব্র সাইরেন ।
বিস্মৃত অতীত আর দিকচিহ্নহীন ভবিষ্যতের মাঝে
এ এক বিচিত্র শূন্যতাময় যাপন ।

তারাপ্রসাদ বণিক

প্রশ্ন

তবে সব প্রশ্ন অমীমাংসিত থাক
কার চামড়ায় বাজাও খুশির ঢাক?
কার গোয়ালে কার বাছুর বাঁধো
দুধেল? না কি সিঁধেল
হা-পিত্যেশের ব্যথায় কেন কাঁদো
কাটা গেলে কর্ণ কিংবা নাক।।

জন্ম-কানায় কী যায় আসে
কামটা সঠিক হলে
ইতিহাসকে কৌটোয় পুরে কেন
ইঁদারাকে সমুদ্র শেখাও ভূগোলে!?

Wednesday, July 18, 2018

ড. শৌভিক বাগচী

নগ্নতা


কে তুমি ?
মেলেনি উত্তর

সেই প্রত্যুষে
স্নান রতা অবিনশ্বর মানবীর গায়ে
বসন ছিল না এতটুকুও |
নগ্নতার পঞ্চশরে
ছিল না রক্তের দাগ ,
পুষ্পিত যাপনে
শুধু বিস্মিত পল
নতুন কাব্য লিখে চলেছে |
শব্দের সৌরভে
ভাসছিলো মেঘ
বৃষ্টিতে ধুয়ে দিচ্ছিলো
অমোঘ চিতাভস্ম ,
ভিজে যাচ্ছিলো রতি
নতজানু নশ্বরের কাছে
এ এক অবাক গীতগোবিন্দম
পুড়ে যাচ্ছে , পুড়িয়ে দিচ্ছে শব |

কে তুমি ?
উত্তর মেলে নি এখনো .

Tuesday, July 17, 2018

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

গুরু আমার মনের ময়লা যাবে কেমনে


আমাদের দুইদিকে দুই বাস্তব ৷ জন্ম আর মৃত্যু ৷ দুই বিশাল অনিবাৰ্য পিলারের মাঝখান গড়ায় জীবন ৷ জন্মে আমরা আনন্দ করি ৷ মৃত্যুতে আমাদের হাত নেই ৷ মৃত্যু আমরা চাইনা ৷ তবু মৃত্যু আসে ৷ স্বাভাবিক নিয়মে ৷ সময়ে বা অসময়ে ৷  জীবন গড়িয়ে যেতে স্বাভাবিক মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই আমরা ৷ সাধের ঘরবাড়ি ফেলে চার প্রিয়জনের কাঁধে চড়ে আরশিনগর থেকে অরূপনগরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মহড়া দিই প্রতিনিয়ত, প্রতিপল ৷ কখন কালের সেপাই এসে তুলে নিয়ে যাবে মহাকালের রথে ৷ জানিনা ৷ চিনিনা ৷ দেখিনা তাকে ৷ কল্পনা করি তার অনিবার্যতা ৷ তবুও তাকে ঘিরেই সৃজনে মাতে এক সৃষ্টিশীল চেতনা ৷ তার নাম মৃত্যুচেতনা ৷ জন্মচেতনার ক্ষণ যতোটা না দাগ কাটে, মৃত্যুচেতনা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ঘিরে ধরে নশ্বরতাকে ৷ মৃত্যু জীবনের শেষ ঠিকানা হলেও তাকে কবি বলেন অমৃতপাত্র ৷ সেই পরম ৷ মৃত্যুর বক্ষ আলিঙ্গনের জন্যে যেন সারাজীবন বিরহকাতরতায় ভোগে বিবাগি আত্মা ৷ সে কিন্তু জীবনকে ত্যাগ করে নয় ৷ জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ৷ জীবনে জীবন যোগ করে ৷ আত্মজীবন, সহজীবন ও অনাগত জীবনের জন্যে কিছু করেই জীবনের পথচলা ৷ এই কিছু করাটাই হলো কল্যাণ ৷ জীবন ও জগতের কল্যাণ ৷
সময়ে হোক অসময়ে হোক মৃত্যু ঘটানোর সঙ্গে মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে গেলে সেখানে আর মনুষ্যত্ব থাকেনা ৷ পশুত্বে পরিণত হয় ৷ লাথি মারা হয় মানবিকতাকে ৷ মানবাত্মার কবর রচিত হয় সেখানে ৷
     সুকান্ত ৷ সুকান্ত চক্রবর্তী ৷ এক তরতাজা তরুণের নাম ৷  আমার প্রান্তিক শহরের আর দশটা তরুণের মতো জীবনযুদ্ধের লড়াকু সৈনিক সে ৷ আমার স্নেহভাজন গুণী ছাত্রদের একজন ৷ ওদের পরিবারের সঙ্গেও আমাদের দুই পুরুষের সম্পর্ক ৷ একসময় সুকান্তর বাবা সুবিমল চক্রবর্তী আমার গ্রামের বাড়ি ছোটোখিলের এক বর্ধিষ্ণু পরিবারের ব্যবসা দেখভাল করতেন আর অবসর সময়ে দর্জির কাজ করতেন ৷ আমরা তাঁকে বিমলকাকা বলে ডাকতাম ৷
আমার পিতৃবিয়োগের পর চরম দুর্দিনগুলোতে যৌবনে যখন মা এবং অনুজদের নিয়ে বেকায়দায় পড়ি সেদিন তিনি তাঁর প্রাগুক্ত মালিকের রেশনশপ থেকে চাল দিয়ে আমাদের পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ৷ তার বাবা সুবিমল চক্রবর্তী দুই ছেলেকে নিয়ে আজীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ে গেছেন ৷ পরিশ্রম করে একটা পরিবারকে দাঁড় করিয়েছিলেন ছোটোখিলে ৷পরে তাঁরা নিজস্ব সমস্যার অজুহাত তুলে তাদের কাজ থেকে তাঁকে ছাড়িয়ে দেয় ৷ তারপর বিমলকাকা দুই ছেলেকে নিয়ে অকূলে ভাসেন ৷ সাব্রুম বাজারে একটা ছোট্ট ঘরে দর্জির কাজ করে অতি কষ্টে সংসার প্রতিপালন করেন ৷ একসময়ে স্ত্রীকেও হারান তিনি ৷ ছেলেদের দায়িত্ব আর দারিদ্র্য দুপাশ দিয়ে তাঁকে ঘিরে ধরে ৷ ছেলেদের যথাসাধ্য শিক্ষিত করে একদিন তিনিও বিদায় নেন ৷

আত্মশ্লাঘা হলেও সত্যি এই সুকান্ত আমার হাতে গড়া ৷  সাব্রুম উচ্চতর মাধ্যমিক ববিদ্যালয়ের  ছাত্র ছিল ৷ সেময়ে স্কুলের বহু অনুষ্ঠানে সে নীরবে অংশগ্রহণ করে গেছে ৷ তাকে বাদ দিয়ে কোনো অনুষ্ঠানে তবলা বাজানো ভাবাই যেতনা ৷  বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রয়াত নিতাই বড়ুয়া প্রতিষ্ঠিত সাব্রুম শহরের 'সুরছন্দ নৃত্য সংস্থা' নামে যে প্রতিষ্ঠানে গান বাজনা শিখত ও পরে শেখাত পনেরো বছর আমি তার সম্পাদক ছিলাম ৷ তার যখন তবলায় উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন অনুভব করে আমাকে জানায় তখন আমি উদয়পুর চন্দ্রপুরের তবলা প্রশিক্ষক নিখিল সূত্রধরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিই ৷ তিনি তাকে বিনা পারিশ্রমিকে তালিম দিয়েছিলেন তার আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ৷
সারাদিন শিখিয়ে খাইয়ে পরিয়ে ফেরার গাড়িভাড়া দিয়ে দিতেন ৷ তার অমায়িক ব্যবহারই সবার মন কেড়ে নিত ৷ সুরছন্দের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নিতাই বড়ুয়ার পরিবারেরই মেয়ে সঙ্গীতশিল্পী তনুশ্রী বড়ুয়াকে বিয়ে করে ৷ দুজনে মিলে
সুকুমার কলার সঙ্গে জীবিকাকে জড়িয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন অতিক্রমণের স্বপ্নদেখা যুবক সুকান্ত ৷ পিতৃমাতাহীন এই যুবক কোনোরকম অনৈতিক সুযোগ নিয়ে বড়ো হওয়ার ভাবনা ছিলনা তার ৷ শত অভাবেও তার মুখমন্ডলের মায়াময় ঐশ্বরিক হাসিটি ম্লান হতে দেখা যায়নি ৷ যেমন ছিল তবলায় নৈপুণ্য তেমনি ছিল ভরাট আকর্ষক কন্ঠস্বর ৷ শিক্ষিত এই যুবক তবলা বাদন শিক্ষাদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে সরকারী বেসরকারী সংস্থার প্রচারমূলক ঘোষণা ও অনুষ্ঠান সঞ্চালনার মাধ্যমে প্রাপ্ত সামান্য অৰ্থ দিয়েই তার ছোটো সংসারটি প্রতিপালন করত ৷ অপেক্ষা করত তার পাঁচমাসের শিশুসন্তানটির কন্ঠে বাবা ডাক শোনার ৷ চিরদুখি সুকান্তর সে ডাক আর শোনা হলনা ৷ তার পরের নৃশংস ঘটনার সচিত্র বর্ণনা আজ বহুদূর ছড়িয়ে গেছে ৷ সারা বিশ্ব হতবাক হয়ে গেছে এই নৃশংসতায় ৷ সে নারকীয় ঘটনার বিবরণ দিতে আমি পারব না ৷ মানুষের মনের অন্ধকার, কুসংস্কার দূর করার জন্যে, গুজবে কান না দেওয়ার জন্যে,গুজবে কান না দেওয়ার জন্যে শুভবার্তা নিয়ে সুকান্ত গিয়েছিল তার সুকন্ঠে আবেদন জানাতে ৷ দায়িত্ব নিয়েছিল মানুষের বিশ্বাস জাগানোর, শুভচেতনার উজ্জীবন ঘটানোর তার কণ্ঠস্বরের ধ্বনি- প্রতিধ্বনির মাধ্যমে ৷
কিন্তু তার কন্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল মানুষরূপী একদল হিংস্র ঘাতকের পৈশাচিক উল্লাসে ৷ শুধু তাই নয় ৷ বাজারভর্তি মানুষ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল সে দৃশ্য কাঠপুতুলের মতো ৷  আর একদল সেলফিবাজ, ক্যামেরাবিলাসী আপনমনে ছবি তোলায় ব্যস্ত ৷ ফাইলবগলে নিরস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী নিস্ফল হাতজোড় করছে ৷ আরে!  পশুপাখিরাও তো আক্রান্ত হলে ঝাঁক বেঁধে চিৎকার করে ! আমরা কী মানুষ আছি আজ?  সুকান্তর অসহায় মৃত্যু সে প্রশ্নই রেখে গেল ৷ মানুষের নিরাপত্তা আজ শূন্যেরও নীচে নেমে গেছে ৷ আমরা যে কেউ যে কোনদিন খরচ হয়ে যেতে পারি ৷
হা ঈশ্বর, শিক্ষা চেতনা আনে ৷ চেতনা বিপ্লব আনে ৷ আনে কী আসলে? সাবরুমের কলাছড়া কিন্তু অশিক্ষিত এলাকা না ৷ এখানে বহু শিক্ষিত, জ্ঞানী গুণীজন, সমাজের দিশা দেখানোর মতো মানুষজনের বাস ৷ অথচ সবাই অশুভ শক্তির হাতে বন্দী হয়ে গেলেন ৷ নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কিছুই করার ছিলনা কারুরই ৷ ত্রিপুরায় বিজ্ঞান সংগঠনতো কম নেই ৷ কাজকর্মও কম করেননা এইসব সংগঠনের কর্মীরা ৷ সুকান্ত তো অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচারে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে ৷ তাঁদের কেউতো আজ পর্যন্ত রা করলেননা একজন সহযোদ্ধার নৃশংস হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে ৷ আমার বহু প্রয়োজনে আমি সুকান্তর সাহায্য পেয়েছি ৷ তার মৃত্যুর দুদিন পরে আমার একসময়ের সহকর্মী বড়দাপ্রতীম দীপক দাস বিকেলবেলা আমাকে ফোন করলেন ৷ আমি তখন সাব্রুম বাজারে ছিলাম ৷ মানুষের গঞ্জনায় কিছু বুঝিনি ৷ উনিও বুঝলেন ব্যাপারটা ৷ একটু পরে দেখা হবে বললেন ৷ আমি বাসায় বাজার পৌঁছে দিয়ে আবার এসে উনার সঙ্গে দেখা করলাম ৷উনি বললেন, সুকান্তর পরিবারের লোক আসবে আমার কাছে পরদিন সকালবেলা ৷ সরকারি আর্থিক সহায়তার জন্যে একটা দরখাস্তের বয়ান লিখে দিতে হবে তাদের ৷ আমি সায় দিলাম কিন্তু কী লিখব আমি ভেবে ঝড়ে তোলপাড় হচ্ছিল আমার অন্তঃকরণ ৷
  পরদিন সকালে আমার বাসায় এল সুকান্তর পরম বন্ধু প্রতিবেশী প্রদীপ চক্রবর্তী এবং তনুশ্রীর ভাই ৷ কী লিখব আমি ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলামনা ৷ বিষন্নতায় আক্রান্ত আমি ৷ একঘর মানুষের সামনে আমি অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি ৷ হাত কাঁপছিল ৷ কলম ধরতে পারছিলামনা ৷ চোখের জলে কাগজ ভিজে যাচ্ছিল ৷ যারা প্রকৃতই চিরদিনের জন্যে কাঁদবে তারা আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে ৷ অতি কষ্টে দীর্ঘ সময় নিয়ে দরখাস্তটা লিখে দিলাম ৷ তার দুদিন পরে আবার একটা অনুষ্ঠানের আয়োজকদের  জন্যে দুটি শোকপ্রস্তাবের খসড়া তৈরি করে দিতে হল ৷ একটি সুকান্তর পরিবারের জন্যে, অন্যটি আমার প্রিয়ভাজন সাব্রুমের আর একজন অকালপ্রয়াত শিল্পী অরুণ নন্দীর পরিবারের জন্যে ৷ কারণ উদ্যোক্তারা ওইদিন একসঙ্গে দুজনের শোকসভার আয়োজন করেছিলেন ৷
আসলে আজ আমরা এতো অসহায় যে হাতে পায়ে শেকলবাঁধা অবস্থায় বধ্যভূমির দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই ৷ আর উত্তরপ্রজন্মের নিধনযজ্ঞের হাড়িকাঠটাও আমাদেরই পুঁতে যেতে হবে ৷ যতোদিন আমরা ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ না হই ৷ যতোদিন সামগ্রিক অর্থে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ না হই ৷ যতোদিন পরিশুদ্ধ চেতনার অধিকারী না হই ৷ আমার মতো অনেকের তো ভাটিবেলা ৷ আমরা  আজ বা কাল চলে গেলে সমাজের তেমন কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হবেনা ৷ কিন্তু যাদের এই সুন্দর পৃথিবীর রূপরসগন্ধস্পর্শ নেবার সময়, তাদের কেন যেতে হবে অসময়ে ৷ অকারণে ৷ নৃশংসতায়, নির্মমভাবে!

(বিশেষ পাতা : সুকান্ত চক্রবর্তী স্মরণে)

Sunday, July 15, 2018

সোমেন চক্রবর্তী

ক্যারাট

ভালো থাকাকে কেন্দ্র করেই আমি গৃহত্যাগী,
তখন থেকেই ভালো ও থাকার মধ্যে বিস্তর ফারাক

সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলে যতটুকু ঘুরে আসি পৃথিবী
ঠিক ততটুকু দূরত্বে দেখেছি যাযাবরের ঘর
যেখানে থাকে বালির চাদর ও পাথরের বালিশ
মাঝে একটুকরো নিরেট বেঁচে থাকা

কাগজে অংক কষে আর্কিমিডিস হতে পারবো না
যেটুকু জল উপচে পড়েছে ততটুকু এবার যাচ্ছি ভুলে,
যাপনের পায়ে থিতিয়ে পড়েছে মরুভূমি লাগা ঋতু
আমি তাকে বসন্ত নামে ডাকি।

(মনের জানালা - সংখ্যা জুলাই ২০১৮)

দুলাল চক্রবর্তী

হারিয়ে গেছে

আমার জীবন যৌবনের অপমৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই।

স্বপ্নের বাসর ছিলো আলো ঝলমল
আজ যেটা অন্ধকারে ঢাকা।

শীতের শিউলি ফোটে আর ঝরে
গন্ধ পাইনা আর।
যৌবনের অপমৃত্যু হয়েছে।

বিষাদের ভাষা যেন বাঁধ মানেনা,
কাশফুলে যেন আর সাদা রং লাগেনা,
দিক্ভ্রান্ত কোন পাখি যেন আর
পথ খু্ঁজে পায়না
নীড়ের উদ্দেশ্যে

বাঁধভাঙা স্রোত আর
নজরে আসেনা।

ফুলে ফুলে উঠেনা জলের ঢেউ
মরা গাঙে আর বান আসেনা ৷
অনেক বসন্ত যেন অজান্তে
গেছে চলে।

যৌবনের মৃত্যু হয়েছে
অনেক আগেই,
ফিরবেনা আর কোনদিন।

অনুপম রায়

সতেরো বছর পর সতেরো বছর পর কি অবসাদ সেটা ধারণা না থাকাই ভালো। যাদের তুমি রেখে গেছ আমাদের হয়ে, তারা এখন উন্মাদ শহরের এক কোণে বসে শ্বাস নেয়। জ...