Saturday, January 23, 2021

মনন স্রোতে আপনাকে স্বাগতম

জয় হিন্দ

সম্পাদকীয়

মনন স্রোত। মননের এক ধারাবাহিক স্রোত। এই নামকরণের পুরোধা এই রাজ্যের বিশিষ্ট ছড়াকার, চিত্রশিল্পী শ্রদ্ধেয় বিনয় শীল। তিনি একনিষ্ঠ কবিতা উপাসক। সৎ, পরিশ্রমী এবং নিষ্ঠাবান বিরল মানুষ। রাজ্যের সাহিত্যজগতে তিনি প্রবীণ মানুষ। এ যাবৎ অনেক কবিদের কাব্যপথের সারথী তিনি। ছড়া নির্মাণে তিনি অনন্য। এই রাজ্যে এরকম শিল্প উপাসক বিরল। আমরা আমাদের এই সংখ্যায় কবি বিনয় শীলকে বিশেষ শিল্প উপাসক হিসাবে সন্মান জানালাম।

আজ ২৩ শে জানুয়ারী। ভারতীয় ঈশ্বরের জন্মদিন। মহান দিনে মনন স্রোত প্রকাশ করতে পেরে আমরা গৌরবান্বিত। নেতাজির আদর্শে আমরা যাতে ভালো মানুষদের সেবাব্রত হতে পারি এই শুভকামনা প্রার্থণা করি। যারা এই বিশেষ সংখ্যাটিতে লিখলেন তাঁদের কৃতজ্ঞতা। যাবতীয় ভুলত্রুটি সম্পাদকের একার। মার্জনাপূর্বক সহযোগিতা চাইছি। সকলে ভালো থাকুন। মনন স্রোতের শুভেচ্ছা নিন।

জয় হিন্দ

শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা-সহ
জয় দেবনাথ
সম্পাদক
মনন স্রোত, ত্রিপুরা

সূচীপত্র

বিটু মজুমদার

কবি বিটু মজুমদারের জোড়া কবিতা

১. স্বপ্নের বন্ধু  

সে দিন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম
পুরানো এক স্বপ্নের সিঁড়িতে,
হঠাৎ চেয়ে দেখলাম তুমি
দাঁড়িয়ে আছো গোলাপ বনে ।

ফুটন্ত গোলাপের সাথে মিশে
চেহারা'টা হয়েছে আরও মিষ্টি,
চোঁখে চোঁখ রাখতে পারিনি
ঝাপসা হয়ে এসেছিল দৃষ্টি ।

আলোক বর্ষ পরে আবার যখন
দেখলাম তোমায় স্বপ্ন ঘোরে,
ইচ্ছা হলো জড়িয়ে ধরি
মাধুরি লতার মতন করে ।

টপকে গেলাম তোমার কাছে
তুমি ধরা দিলেনা প্রিয়া,
কোথায় যেন হারিয়ে গেলে
ভেঙে দিয়ে হিয়া 


২. কন্যা বাঁচাও কন্যা পড়াও


কন্যা বাঁচাও, কন্যা পড়াও,
কন্যা হত্যা রোধে রুখে দাঁড়াও।।
কন্যারা হয় বধূ ভগ্নিমাতা,
পুরুষ-নারীর জন্মদাতা।
রোগে শোকে তারাই পবিত্রতা,
তাদের আরো শক্তি জোগাও।।

মায়ের পেটে আছে যে ভ্রুন কন্যা।
তাকে হত্যার কত পরিকল্পনা।
খুনি পিতা-মাতা চায়না কন্যা।
তাদের কঠোর শাস্তি দাও।।

কন্যা আছে প্রতি ঘরে, 
সব দেশে সব পরিবারে।
কন্যা নাই সৃষ্টি নাই শান্তি হবে চির উদ্ধাও।।

প্রতিদিন কন্যা হচ্ছে নিধন,
চলছে শোষণ আর নির্যাতন।
পনের শিকার হয়ে পড়ছে কন্যা,
হিংস্র অসুরদের ঘুম ভাঙাও ।।


সজীব পাল

কবি সজীব পালের জোড়া কবিতা

১. ব্যর্থতার প্রতীক 

কী নাম ? কৃষ্ণচূড়া? বকুল ফুল?
আমরা কেউই তার নাম জানি না!
চোখ তার দিঘির জলের পদ্মকমল
যেখানে লেখা নিশীথ পাখির গান।


২. হেমন্তের সংসারে 

হেমন্তের সংসারে তোমাকে দেখেছি,
হেমন্তের মতো সবুজ থেকে হলুদ হতে।
তোমাকে দেখেছি নির্জন গলির পথে,
এই আমাকেই ঘৃণা করে চলে যেতে ।
ফুলের রেণুর মতো নীরবে ঝরলে 
প্রশ্বাসে বাড়ালে কি কষ্ট!
এই দারুণ বিষাদে নদীর মতো শুকালে ,
খাঁচার পাখির মতো হারালে,
লোকালে দূরত্বে খুব;
বুঝবে কে ছিলাম আমি তোমার ভেতর!
বুকের রক্ত মাংস কতটুকু খেয়েছি!
বুঝবে সজনী তুমি বুঝবে।
চোখ তো মানুষের সব নয় ?
তবুও তোমার চোখেই দেখেছি ,
প্রণয়ের ভাস্কর্য,শিল্পীর মৃত্যু ।

অতনু রায় চৌধুরী

কবি অতনু রায় চৌধুরীর জোড়া কবিতা

১.অপেক্ষা

আমি শূন্যতায় বেঁচে আছি
একাকীত্বের কাছাকাছি ।
জমা হাজারো অভিমান কিংবা আবদার । 
আমার স্বপ্নের ঘর ভাঙছে রোজ
হচ্ছে জীবন ছারখার ।
তবুও এই শহরে‌ বুকে, চলছি হাসি মুখে 
অপেক্ষা সময় বদলাবার ।
এই কঠিন সময় অতীত হবে
হয়তো সু'দিন আসবে আবার ।


২. বন্ধুত্ব

চলার পথে যখন হঠাৎই মনখারাপ 
কিংবা হাজারো সমস্যা জীবনে ।
তখন একটা বন্ধু ঠিক ই লাগে ।
কেউ সেই বন্ধু পেয়ে যায় 
আবার কেউ পুরো জীবন সেই বন্ধুকে খুঁজে বেড়ায়।
বন্ধুত্ব লিঙ্গ ভেদাভেদ বুঝে না
বন্ধুত্বের মাঝে থাকে না জাতি ভেদাভেদ ।
বন্ধুত্ব সমবয়সী দেখে হয় না 
আসলে দুঃসময়ে বন্ধুত্বের প্রয়োজনটা অনেক ।

জগন্নাথ বনিক

কবি জগন্নাথ বনিকের জোড়া কবিতা
 
১. দুর্ঘটনা 

দুর্ঘটনা একটি সামাজিক ব‍্যাধি,
হচ্ছে তো আজ অনবরত।
মায়ের কোল যে খালি হচ্ছে,
প্রতিটা  দিনের মতো ।।

বাবা, মা, হারাচ্ছেন ছেলে মেয়েদের,
আপনজন হারাচ্ছেন  আজ সবাই।
দুর্ঘটনা যে  থামছে না  আজও, 
কী হবে এখন মোদের বাঁচার উপায় ।।

দুর্ঘটনায় আজ পঙ্গুত্ব হয়ে  আছেন,
 অনেকেই  ঘরে  বন্ধী।
মৃত্যু তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে,
হারিয়েছে অনেকেই জীবন সঙ্গী ।।

পঙ্গুত্ব জীবনটা কে ভালো বাসে না, 
অনেকেই  আপন মনে ।
দূর্ঘটনায়  আহত ব‍্যাক্তিরা বেঁচে থাকেন, 
জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ।।

ভালো থাকুক বিশ্ব পৃথিবী,
ভালো থাকুক আপনজন।
আর যেন না দেখতে পাই, 
দুর্ঘটনার মতো প্রতিবেদন ।।


২. বর্ণমালা 

মায়ের কোলে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রথম যেদিন,
দেখেছি পৃথিবীর আলো।
চিৎকার করে কান্না করেছি,
অন্ধকারের চেয়ে পৃথিবীর আলো,
অনেক বেশি  ভালো ।।

পৃথিবীর আলো দেখার পরে, 
দেখেছি  মায়ের  মুখ।
সুন্দর এই নির্মল পৃথিবী, 
চারিদিকে অপরুপা রুপ।।

জ্ঞানের আলো ছড়াবো বলে, 
মায়ের কাছে দেখেছি প্রথম বর্ণমালার বই।
অ, আ, ক, খ, দেখেছি প্রথম,
স্বরবর্ণের, ব‍্যঞ্জনবর্ণের, আরও ছড়া গল্পের বই।।

কাঁধে ব‍্যাগ ঝুলিয়ে প্রথম যেদিন,
গিয়েছিলাম  মোর স্কুলে।
শিক্ষক, শিক্ষকা, এবং ছাত্র, ছাত্রীর দিকে , 
তাকিয়ে  রইলাম  আমি  অবাক চোখে ।।

পঠন, পাঠন দেখেছি প্রথম , 
পেয়েছি  বিদ‍্যার শিক্ষা । 
জ্ঞানের আলো ছড়াবো বলে , 
করেছিলাম  মোর প্রতিজ্ঞা ।

সুকান্ত বসু

কবি সুকান্ত বসুর জোড়া কবিতা

১. খুঁজে বেড়াই
     
প্রেম ছিল ভোরের শিশিরে,
সেই পড়ন্ত বিকেলের সূর্যাস্তে।
বর্ষার স্যাঁতস্যাঁতে পুকুর পাড়ে,
ফুল বাগানের দৈর্ঘ্য-প্রস্থে।
জোনাকিরা ঘোরাফেরা করতো,
পূর্ণিমার জোছনা ভরা রাতে।
যখন তুমি ফুল কুড়োতে বের হতে,
সেই সোনালি শারদ প্রাতেঃ।
ফেরত চাইছি সেই দিনগুলি,
ময়ূর-ময়ূরীরা পেখম মেলতো যখন।
পারবে কি ফিরিয়ে দিতে,
সেই দিনগুলি আবার এখন।
ছাব্বিশটি বসন্ত পথ চেয়ে,
বসে আছি তোমার।
ভাবছি এবার আগের মতো,
প্রেমে পড়বো আবার।


২. শীতের সকাল         

প্রকৃতির পালা বদলে আসে,
কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল।
রাতের ঘন নিস্তব্ধতা কাটিয়ে,
শুরু করা আরেকটি নতুন দিন।
শীতের শীতল শিশির বিন্দু,
দূর্বা ঘাসের কচি ডগায়।
শিশুরা ঠান্ডা থেকে মুক্তি পেতে,
রোদে বসে করতো খেলা।
খেজুর গাছ থেকে গাছিরা,
নামিয়ে আনতো রসের হাঁড়ি।
চাদরের ভেতর থেকে,
হাত বের না করার চরম সুখ।
পৌষ পার্বনে থাকতো,
পিঠা-পুলি ও নানা অনুষ্ঠান।
আজও মনের অলিগলিতে ঘোরে,
সেই সোনাঝরা দিনগুলি।

উজ্জ্বল ভট্টাচার্য্য

কবি উজ্জ্বল ভট্টাচার্য্যের জোড়া কবিতা

১. এপার থেকে ওপার

যতদিন না মাথার কাছে
একটা হৃষ্টপুষ্ট তুলসী গাছ
শোভা পায়,
ততদিন একটা ইঁদুরও বেহিসেবি হয়ে
গা ঘেঁষে পালাতে চোখে পড়ে না।
মানুষ তো ঐ আকাশের মেঘ।

আমি দেখেছি,
সেই শেষবার ঘুমিয়ে গেলে,
শকুনও কতটা আহ্লাদে বুকের উপর দাঁড়ায়।
শুধু মানুষগুলোকে দেখি বকেয়া ঋণের কিস্তি নিয়ে কানাঘুষো করছে!

চোখ বুজে নদী পার করার পর,
মানুষ ওপারে এলোপাথাড়ি শান্তি পায়।
এপারে ভীড় বাসে সময়ের বড্ড তারাহুড়ো।

২. সময় অসময়

সেই যে ভালোবাসার মহোৎসবে
তোমার নিষ্ঠুর হাসি
আমাকে দু'কোটি কান্না প্রস্তাব করেছিল,
তার একটাও এখনো অবধি 
শুরু করা হয়নি।
যোগ্য একটা শূন্য ঘরের বড্ড অভাব!
তোমার চোখের সাথে মুখের,
কোনো কোনো দিন আমি দূর দূর মিল খুঁজে পাই না।
আবার হয়তো এইসব আমার
এই জন্মের শ্রেষ্ঠ ভুল।
তবে ঈশ্বর না করুক!

পৃথিবী বলতে মানুষ যতটুকু বোঝে,
তোমার চোখে আমি তার দ্বিগুণ দেখেছি।
শুধু তুমি আমায় খুন করে ফেলছ মনে পড়লে
সেভাবে আর বাঁচতে রূচি পাই না।
নাহলে সময়ে অসময়ে সবাই ই তো
হাসার অধিকার রাখে।

গৌতম দাস

কবি গৌতম দাসের জোড়া কবিতা

১. তোমায় ভালোবেসে

নীরপূর্ণ পুকুরে ব্যাঙঢিঁল ছুড়েছি ,
বিরহের সাগরে ডুবুরি সেজেছি আমি
শুধু তোমায় ভালোবেসে।
জলন্ত বহ্নিতে মুক্ত  চিত্তে হাত রেখেছি।
জ্যোৎস্নাময় যামিনীতে তন্দ্রাহারা হয়েছি;
শুধু তোমায় ভালোবেসে।
নির্জন পথের স্তব্ধতা মেপেছি আমি
অহংকারের সিংহাসনে বসেছি;
শুধু তোমায় ভালোবেসে।
ক্ষুধাকে শিকার বিদ্যা শিখেছি আমি,
তোমার চাঁদমুখের হাসিতে নিজেকে হারিয়েছি
উত্তপ্ত মরুভূমিতে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করেছি;
 শুধু তোমায় ভালোবেসে।
আজ এই শুভ ক্ষণে তোমার শূন্য উপস্থিতি
অকৃত্রিম ভালোবাসার এই নির্মম পরিণতি?
আহা! উন্মুক্ত চিত্তও আজ দ্বিধাবোধ করছে
কন্ঠরোধ হয়েছে তার,বলতে সে অক্ষম
শুধু তোমায় ভালোবেসে।


২. দাদুর শেষ ইচ্ছা
                                                               
কীরে অন্ধকার ঐসেরে নাতি।
তাড়াতাড়ি জ্বালা একটা মোমবাতি।
কই যে কিতা করস্।
সারাদিন শুধু বই পড়স্।
আমার মাথা  এমনই চড়া।
বাদ্ দেলা তর্ লেহাপড়া।
অ দাদু এই পিঁড়িডাত্ ঠান্ডা  মাথায় বৌ।
কিতা কইবা কৌ।
তরে কইছিনা সকালে ক্ষেত যাইবি।।
আর দুপরে দুইল্ল্যা পান্তাভাত খাইবি।
পইড়া কী চাকরি পাইবি?
আমার বয়স ঐল আশি।
কবে জানি হই  স্বর্গবাসী।
ঐ একটা কথা শুন্ নাতি।
তুই আমার বংশের শেষ বাতি।
বয়স তর চৌদ্দ, কেউ কয়না মন্দ।
অহনে তর পড়া একবারে বন্ধ।
বুড়া বয়সে আমার শেষ ইচ্ছা।
তরে করাইতাম বিয়া।
নাতি বউ এর ভাত খাইতাম
তর শ্বশুর বাইত্ গিয়া।
না !দাদু করন যাইতনা এই বিয়া।
আগে লেহাপড়া শেষ করি
হাতো সময় আছে ভুরিভুরি।
কিতা?
বড় কথা কস্ সুডু মুখ দিয়া।
আমার মরা মুখ দ্যাখবি শ্মশান গিয়া।
না!না!দাদু পূরণ করুম তোমার  আশা।
দুঃখ ডা এহান-
তুমি বুঝলানা আমার মনের ভাষা।
ভাবছিলাম বড় ঐয়্যা চাকরি করুম।
অহনে অকালে বিয়া কইরা
একবারে মরুম দাদু!
একবারে মরুম।         
     

অনুপম রায়

সতেরো বছর পর সতেরো বছর পর কি অবসাদ সেটা ধারণা না থাকাই ভালো। যাদের তুমি রেখে গেছ আমাদের হয়ে, তারা এখন উন্মাদ শহরের এক কোণে বসে শ্বাস নেয়। জ...