Sunday, October 10, 2021

গৌতম মজুমদার

এমন একটি গ্রাম আমি চাই


এমন একটি গ্রাম আমি চাই ---
যে গ্রামেতে মন্দির মসজিদ নাই,
আছে শুধু রাম রহিমের বাস
এক সাথেতে নিচ্ছে তারা শ্বাস।

এমন একটি গ্রাম আমি চাই---
যে গ্রামেতে হিংসা বিদ্বেষ নাই,
পূজা নামাজ পাশাপাশি চলে
সাম্প্রদায়িক বীজটা ফেলে জলে।

এমন একটি গ্রাম আমি চাই---
যে গ্রামেতে হাসেম গনেশ ভাই,
এক থালাতে খেতে পারে বসে
মুক্ত মাঠে ঘুরতে পারে চষে।

এমন একটি গ্রাম আমি চাই---
যে গ্রামেতে শান্তি খুঁজে পাই,
সেথায় গিয়ে বাঁধবো সুখের নীড়
নানান রঙের থাকবে পাখির ভীড়।

এমন একটি গ্রাম আমি চাই---
যে গ্রামেতে থাকবে হাসিটাই,
প্রাণ খুলে সব মনের কথা বলে
এমনি করে জীবনটা যায় চলে ।

এমন একটি গ্রাম আমি চাই---
যে গ্রামেতে আছে যুবকরাই,
রক্ত দানে সবার আগে থাকে
বুক চিতিয়ে গ্রামকে আগলে রাখে।

এমন একটি গ্রাম আমি চাই---
যে গ্রামেতে সংহতির অভাব নাই,
বিপদ মাঝে সবাই ছুটে আসে
দাঁড়ায় তাঁরা সবাই সবার পাশে।

এমন একটি গ্রাম আমি চাই---
যে গ্রামেতে প্রাণটা ফিরে পাই,
মিলে মিশে থাকবো মোরা গ্রামে
লেখা হবে সৌভ্রাতৃত্বের নামে।

লিটন শব্দকর

নিবিড়ে ১


থাকি না হয় আমি একটু দিশেহারা,
পলকগুলিকে থাকতে দিয়েছি তাই
কলাপাতায় খিচুড়ির ঘ্রাণের দুপুরে।
তুমি এইটুকু দেখে জেনেছো বলেই
সহজবাড়িতে অর্কিডের পরিচর্যায়
তোমার হাতে অস্তরাগে রঙিন নক্সা।

মোহাজির হুসেইন চৌধুরী

কিছু রঙ একটা তুলি

পেয়ালার আঁশটে গন্ধ 
অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে
ভেজানো রঙের কালি বাসি হয়ে
ফ্যাঙাসের ঘরবাড়ি.... 

আমি দেখছি-- আমরা অনেকেই  দেখছি
বহুদিন থেকে
কিন্তু---
আজ হঠাৎ মনে পড়লো ওগুলোকে সরিয়ে নিতে 
প্রয়োজন নতুন রঙ নতুন তুলির
এখন নতুনভাবে আঁচড় কাটা যাক
ভ্যানগগের সূত্র ধরে জন্ম নিক
নতুন আলোকচিত্র
সদ্য প্রজন্মরা শিখে নিক
রেলের সুবিন্যস্ত পথে ঘুম চোখে
ক্ষুধার্ত রুটি ফেলে রেখে বাঁচার অধিকার
চিত্রিত হোক দুর্বোধ্য সকল ছবি সরিয়ে দিয়ে
পূর্ণিমার প্রোজ্বল স্বচ্ছ সৌম্য বোধ 
আকরিক অক্ষরে লিখা হোক
নারীর বৈশ্যাময় শরীরের প্রতিবাদ 
নতুন রঙের কালি আর এক জীবন্ত তুলি
এঁকে দিক কৃষকের ঘামঝরা রক্ত-খুনে মাখা
জমিনের সবাক চিত্র
ফসলের বুকে বাঁকা চাঁদের মতো
হাসি ফুটে উঠুক মুখেমুখে।     

মাহমুদ মুকিত

স্মৃতির নোনাজল 

স্মৃতির নোনাজল ঠোঁট ছুঁয়ে গেলে
সুমিষ্টঘ্রাণে ভরে ওঠে সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার। 
নিউরনে নিউরনে অবগাহন করে
অস্তমিত সূর্যের স্বর্গীয় সুখ। 
অথবা চিরতার আধ বুক তিক্ত জলে
দ্বীপ খুঁজে ক্লান্ত হয়ে যায় 
আজন্ম সাঁতার না জানা হোমো সেপিয়েন্স। 
হোক সে ট্রয় নগরীর ধ্বংস্তুপ
অথবা ফুলেল সজ্জিত রাজ উদ্যান 
স্মৃতির অমোঘ সুতোয়
পরতে পরতে গেঁথে রয় জীবনের জয়গান ।  

অভিজিৎ রায়

মা দুই টাকা দাও
             

ছোট বেলায় মনে আছে দু টাকার কথা?
স্কুলে যাওয়ার সময় বলতাম 
মা দুই টাকা দাও না গো
স্কুলে গেলে আসার সময় লোপ না কেক খাবো।

মা বলতো প্রতিদিন টাকা কোথায় পাবো
তোর বাবা কত কষ্ট করে উপার্জন করছে
আর তুই টাকা নষ্ট করছিস?
দুই টাকার সাথে আর কিছু দিলে চাল আনতে পারবো 
সবাই মিলে একসাথে খেতে পারবো। 

দেখ তারপর ও তুই যদি বায়না করস টাকা আমি দেবো
না মা লাগবে না আমরা টাকা সবাই মিলে একসাথে ভাত খাবো

আমি লোপ কেক খাব না মা কিছু বল না বাবাকে ।
এমনিতে মিথ্যা কথা বললাম আমি তোমাকে।

চুখের জল এসে যায় এখন 
আজ যখন হাতে অনেক টাকা 
কিন্ত মায়ের সেই ভালবাসা টুকু 
আজ যেন অনেক ফাঁকা

কথায় কথায় বলে তোর মত ছেলে জন্ম দিয়ে ভুল করেছি
একটা মেয়েকে জন্ম দিয়ে শান্তি পেয়েছি।

আজও বুঝলাম না মা আমার প্রতি কেন এমন ব্যাবহার?
হয়তো বা বড় হয়ে উচিৎ কথা বলতে গিয়ে হচ্ছে আমার প্রতি অবিচার।

এখনো মনে পড়ে সেই স্কুলে যাবার সময় বিস্কুটের কথা
বলতে পারি না কাউকে মা লাগে মনে শুধু ব্যাথা।

তবুও প্রার্থানা করি মা ঠাকুরের কাছে
জীবনের শেষ লগ্নে হলেও যেন নিজের ভুল
 চুখে ভাসে।

মোঃ রুবেল

না

না,
সদ‍্য প্রসব হওয়া গোলাপটা,
তোমাকে প্রেম নিবেদনের জন‍্য নয়।
ভালোবাসা কতটা সুন্দর ও স্নিগ্ধ তার প্রতীক।
গাছটা তোমাকে ভালোবেসে লাগিয়েছিলাম।
পরিচর্যা করেছিলাম প্রেমিকার মতো।
আমার কাছে লাল গোলাপটা তুমি। 
একান্তই তুমি।
তুমি যখন অভিমানকে আপন করে দূরে থাকো।
তখন আমি একটু একটু করে গোলাপটার কাছে যাই।
ছুঁয়ে দেখি। তোমায় অনুভব করি কাছে। খুব কাছে।
এই গোলাপটা আমার।
একান্তই আমার।

দুলাল চক্রবর্তী

আগমনীর সুর
      
" মাতার কন্ঠে শেফালী মাল্য
        গন্ধে ভরিছে অবনী,
   জলহারা মেঘ আঁচলে খচিত
        শুভ্র যেন সে নবনী।"
শিউলি ফোটার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি জানান দেয় শরৎকাল এসে গেছে। সুনীল আকাশ টা সাদা সাদা স্তূপাকারে মেঘ
ধেয়ে চলে এদিক ওদিকে। নদীর ধারে ধারে সাদা সাদা কাশফুল অনাবিল আনন্দে যেন এদিক থেকে ওদিকে ঢলে পড়ে। মাদকতা এনে দেয় ওদের গায়ে গায়ে। গাভী দল প্রাণ খুলে ঘুরে ঘুরে খাবার খায়। যেন একান্ত মুক্তমনা, রাখালিয়ার প্রাণ কারা সুরে বাজে বাঁশি।
প্রকৃতির রূপে আসে ঋতু রানী শরতের 
মোহময়ী ছাপ। প্রতিটি বাঙালির মনে 
আনন্দে ভর ধরে না। মা আসছেন! বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের সারা। শরতের রাতের মোহময়ী নীল আকাশ।
রাতে যখন পূর্ণিমা চাঁদের রূপালী আলো পড়ে--আকাশটা যেন নীলের ছটা ছিটকে ছিটকে ছাড়ে । মাঝে মাঝে সাদা তুলার পানশী যেন এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়ায়।
শরতের পূর্ণিমার চাঁদের দুর্লভ আলো বড় মন কেড়ে নেয়। রাতে শিশির সিক্ত হয় শেফালী গুলো প্রাণভরা মনকাড়া গন্ধ ছড়ায়। আহ, কি দারুণ প্রাণ কারা সুগন্ধ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভোর হতেই ঝরে পড়ে নিচে। চলে যায় দেবতার পায়ে। সযতনে ফুলগুলি তুলেনিই।
দূর দেশের প্রবাসীরা ছুটে আসে আপনজনের কাছে মায়ের রাতুল চরণে ভক্তি অর্ঘ্য নিবেদনের জন্য। বাংলার বুকে দুর্গাপূজার অনুভূতি ও আনন্দই আলাদা। সারাবাংলা বুকে যেন মনে হয়--
" স্থলে- জলে আর গগনে গগনে,
বাঁশি বাজে যেন মধুর লগনে। " এই পুণ্য লগনে বেজে ওঠে মায়ের মঙ্গল শঙ্খ। অপরূপা জননী যেন দুহাত ভরে আশীর্বাদের ডালি নিয়ে আসে বাংলার বুকে! প্রাণের আবেগে, উৎসবের আনন্দে বাংলার ঘরে ঘরে মহাসমারোহ চলে । পূজার কটা দিন যেন কোনো বিধিনিষেধ মানে না। আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মন। সারাটা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বাঙালিরা মাতৃ বন্দনার জন্য।

অভীককুমার দে

জলমিছিলের স্রোত 

অনন্ত তপস্বী মাটি। মাটির হৃদয় পাঠ করতে করতে কেউ মাটিকে অনুভব করে, কেউ করতে পারে না। যারা অনুভব করতে পারে, মাটির সন্তান ওরা। ওরা মাটিবুক ভেদ করে শূন্য বুকেও মেলে ধরতে জানে ফসলের নদী। এই নদী আগামীর জীবন। এই নদীজল দৃষ্টির আলো। অন্ধকারের পথ পথিকের হৃদয় খোঁজার রশ্মি জোগায়। এই নদীপথ সমূহ সুখের, জীবনসুর। যদিও শূন্যে মাথা রেখেই মাটির নাড়ি আঁকড়ে ঝুলে থাকে, তবুও বুকের সেতার বেজে উঠলে বাতাসের কানে যৌবনের গান। তারপর সবুজ নদীটি রোদ মাখে, মায়াবী দেখায়। সোনালী রঙের অলংকার পড়ে পায়ে পায়ে হেঁটে গেলে জীবনের জলকথা। শিহরিত বয়স আরো উতলা হয়, তানপুরা ছন্দ যখন স্রোতের মতো, এগিয়ে যায় শরীর থেকে শরীরে। 

কিছু মানুষ, দিনের পর দিন বিকশিত শরীর দেখে স্বপ্ন সাজায়। বেঁচে থাকার স্বপ্ন। বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় জীবন। জীবিকার কষ্টপাড়া পেরিয়েও এই মানুষ নিজের জন্য বাঁচে না। বাঁচবার চেষ্টা করতে করতে কেবল বাঁচিয়ে রেখেই মরে যায়। যতদিন বেঁচে থাকে আল থেকে আলে ঘুরে ঘুরে আগলে রাখে জমি। 

জমি ফসলের জন্য, মাটির সংগঠিত আয়োজন। লালন করতে করতে লালনের মতো নির্ভেজাল তপস্বীর তপস্যাঘর। ঘরের সাথে ঘর যেমন, জমির সাথে জমি। বুকে বুক লাগিয়ে সুখের পত্রিকামাঠ। এখানে ফসলের মেলা বসাবে বলে সেই মানুষগুলো কাঁচি হাতে, কোদাল হাতে আজন্ম চাষা। ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে চায় বলেই স্বপ্ন বোনে। ফেরি করে স্বপ্নসময়। 

একটু একটু বড় হয় নদীটি। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে সোনালী সুখের রথ। এই রথে যিনি রাজা দুধের শিশু। বুকে সূর্যের তাপ শুষে হামাগুড়ি দেয় ভেতর ঘরে। শক্ত হয় শরীর। বেড়ে উঠতে উঠতে একদিন পূর্ণতায় ভরে ওঠে। এই পূর্ণতা মাটির আদর। মায়ের বুকের দুধের মতো প্রাণীজ শিশুর শক্তি জোগায়। এমন সুখভাবনায় চাষির কপালে ধ্যানবিন্দু আলোকিত হয়। 

যেই আলো পথ দেখানোর জন্য, সেই আলোকেই নিভিয়ে দিতে চায় পরগাছার দল। ফসল ধ্বংসকারী আবহ তৈরী করে সাময়িক বেঁচে থাকে ধ্বংসস্তুপের উপর। এরা জীবনের জীবাণু আর পোকামাকড়। ফলন্ত জমির বুকে আক্রমণ করে স্বপ্নের সবুজকেই দিশেহারা করে দেয়। আবার এরা কখনো কখনো মেঠো ইঁদুরের মতো, ভয়ঙ্কর। কষ্টের জল যখন নদীস্বপ্নে ঝর্ণার মতো ঝরে, ঠিক তখনই ভেঙে দেয় সমারোহ। চাষির কপালের মাটি ক্ষত হয়। গোড়া থেকে কেটে ফসলের স্বপ্নকেই তছনছ করে দেয়। প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে পড়ে থাকে মাটি। বোকার মতো চেয়ে থাকে নিঃস্ব জমি। বোবার মতো চেয়ে থাকে চাষি। 

এই যন্ত্রণা, এই বোকা অনুভব, এই বোবা চোখ শূন্যকেও ভারি করে তোলে। এক অদ্ভুত ভয়াবহ চুপ সময় অচল করে পদক্ষেপ। সেই এক শিহরণ জাগানো ভাষা। বুক থেকে মস্তিষ্ক পথে চোখ ভাসিয়ে নেমে আসে নিঃশব্দ ব্যথা। নদীর জন্যই কেবল অবিশ্বাস্য রূপান্তর। 

অভীক বলে, হিমালয় কখনও জলশূন্য হতে পারে না। নদী তার জেগে উঠতে জানে। দুর্বার গতিতে নেমে আসতে পারে জলমিছিলের স্রোত। এই গতিপ্রবাহের সামনে কোনও বাঁধ চিরস্থায়ী নয়। নদী তার উচ্ছ্বাসে ভেঙে, গুড়িয়ে, উড়িয়ে দেবে সব বাধা। 

দীপক দাস

দুর্গা পূজার আলোয়- জীবনের নানা পর্যায়


সমগ্র জীবনকে যদি চারটি পর্যায়ে  ভাগ করি তবে এই চার পর্যায়ে  পূজোর আনন্দের  স্বরূপ কেমন তা আজকের বেলা শেষে ফিরে দেখতে ইচ্ছে  করছে।প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ  নিতান্ত শৈশবে পূজোর অনেক আগে থেকেই শরীরে মনে আনন্দধারা জেগে উঠত। আমরা আঁধারমানিক  নামক যে গ্রামটিতে থাকতাম, আমাদের বাড়ীর  খুব কাছেই মূর্তি তৈরী হত।মূর্তির  মাটি আমাদের বাড়ীর পাশের জমি থেকে নেওয়া হত। মাটি নিতে নিতে গর্তগুলি খুব গভীর হয়ে যেত।ছোট বয়সে যেতাম গর্তগুলির গভীরতা দেখতে।ভয় ও পেতাম।সে ভয় আজ ও তাড়া করে স্বপ্নে।অনেকদিন স্বপ্নে দেখেছি আমি গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে যাওয়ার  ভয়ে কাঁদছি। আমার পাশে কেউ নেই।ভোর হলেই ছুটতাম  প্রতিমা কতটুকু হল তা দেখতে।সারাদিনই ছিল এই আনাগোনা। প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের চোখের সামনে মৃণ্ময়ী  মূর্তির  অবয়ব তৈরী হচ্ছে আর আমরা অপলক বিস্ময়ে তা প্রত্যক্ষ  করছি,যে আনন্দ আজ শুধু স্মৃতিপটে লেখা হয়ে আছে। পূজোর সময় এবং সন্ধ্যায় মা বাবার হাত ধরে পূজো প্যান্ডেলে যেতাম, আরতি প্রতিযোগিতা  দেখতাম, কেউ কেউ ছটা বা আটটা ধূপতি নিয়ে আরতি করতো।ঘুমে চোখ জুড়ে এলে মা বাবার হাত ধরে বাড়ী ফিরে আসা, এভাবে চলত পূজোর ক - দিন।
আস্তে আস্তে শৈশব অতিক্রম করে কৈশোর ও যৌবনে পদার্পণ  করছি। শুরু হল জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়।এ সময় পৃথিবীর আলোতে বাতাসে আকাশে জলে স্থলে অন্তরীক্ষে শুধু আনন্দ আনন্দ আর আনন্দ। যেন আনন্দধারা  বহিছে ভুবনে। বাইরের পৃথিবীতে  পা রাখছি, মা বাবার হাত ছেড়ে দিয়ে বন্ধুদের  হাত ধরে চলতে শুরু করেছি। এসময় পূজোর দিনগুলো নানা পরিকল্পনায় ঠাসা থাকত। কোনদিন কখন কোথায় কারা কিভাবে পূজো দেখত বেরুব,  কত পরিকল্পনা! অনেকে একসাথে সাইকেল করে পনের বিশ কিলোমিটার  দূরে পূজো দেখতে যেতাম। সবাই মিলে গেয়ে উঠতাম" ও আকাশ সোনা সোনা/ এ মাটি সবুজ সবুজ/ নূতন রঙের নেশায় হৃদয় রেঙেছে/ আলোর জোয়ারে খুশীর বাঁধ ভেঙেছে।"
 বা গাইতাম " এ পথ যদি না শেেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলতো। এরকম কত গান।
পরবর্তী  সংখ্যায়  সমাপ্য।

পোষাকে চুলের পারিপাট্যে ছিল যত্নের আধিক্য।তখন সাবরুমে পাঁচ সাতটা পূজো হত।বিভিন্ন পূজো প্যান্ডেলে দেখা হত বান্ধবীদের  সাথে। হাত নাড়ানো দু একটা কথা।অপরূপ সে সব মিষ্টি  অনুভূতি।আবার মনে মনে বিশেষ কারো সাথে দেখা হওয়ার উত্তেজনায় কাটত সারাদিন। সেই বিশেষ একজনের সাথে হয়ত দেখা হয়েছে কিন্তু অব্যক্ত  থেকে গেছে মনের কথা বলা। আসলে এই পর্যায়ে অনেক ভালোলাগা বুদবুদের মত মিলিয়ে যায় সময়ে। বলা যায়না বেশিরভাগ কথাই।বিশেষ করে মনে পড়ে দশমীর দিনের কথা।সাবরুম মেলার মাঠে সব প্রতিমা এসেছে। আরতি প্রতিযোগিতা হচ্ছে,  মাঠের মধ্যে বন্ধুদের  সঙ্গে ঘুরছি।মৃণ্ময়ী মূর্তি দেখতে দেখতে বার বার চোখ খুঁজে ফিরছে ভালোলাগা মানুষটিকে।কখনো চোখাচোখি  কখনও বা দু একটা ইশারা করে কথা ছুঁড়ে দিয়েছি তার উদ্দেশ্যে। না চাইলেও এক সময় শেষ হয় বিসর্জনের অনুষ্ঠান। যৌবনের সেই সব দিনগুলোতে আমরাও প্রতি বছর বিসর্জন দিয়ে আসি আমাদের অসংখ্য  ভালোলাগাকে ভালোবাসাকে।রিক্ত হাতে ঘরে ফিরে আসি।
এরপর শুরু হয় তৃতীয় পর্যায়ের জীবন।চাকরি- বাকরি ঘর সংসার- স্ত্রী - পুত্র - কন্যা নিয়ে নূতন এক জীবন।এ জীবনের দাবী অন্যরকম।জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। স্ত্রী  পুত্র  কন্যাকে খুশী করতে হবে।কারন এদের জড়িয়েই তো জীবন।এ সময়ে পূজোর আনন্দ নূতন রূপে ধরা দেয়। প্রথম দু পর্যায়ে আমি ছিলাম খেলোয়াড়।মাঠে খেলছি।খেলার মধ্য দিয়ে আনন্দ উপভোগ করছি।এই পর্যায়ে আমি দর্শক।এপর্যায়ে পুত্র  কন্যাদের জামা কাপড় পরিয়ে ওদের আনন্দিত মুখ দেখে আমিও আনন্দ উপভোগ করেছি।দুটি ভিন্ন স্বাদের।তবু এতদিন পর্যন্ত জীবনের স্বাদ ছিল।
আজ এসে দাঁড়িয়েছি জীবনের নূতন এক পর্যায়ে।পূজোর দিনগুলোর শুরুতেই কেবলি মনে হচ্ছে শুরুর চারদিন পরেই বিসর্জনের বাজনা বাজবে।সব আনন্দ ছাপিয়ে কানে আসছে কেবলি বিসর্জনের বেদনা।জীবনের অন্য পর্যায় গুলোতে মনে হত, এইতো আবার আসছে পূজো।এখন মনে হয় আর নাও দেখতে পারি আগামী বছরের পূজো
।জীবনের শুরুতে আকাশে বাতাসে জলে স্থলে অন্তরীক্ষে আনন্দধারা  প্রত্যক্ষ  করেছিলাম।আজকের এই গোধূলি লগ্নে সমস্ত বিশ্ব চরাচরকে মনে হচ্ছ আমারি মত বিষাদগ্রস্ত।
তবু অধীর আগ্রহে নাতি নাতনির হাত ধরে অপেক্ষা  করে আছি পূজোর  জন্য।বিসর্জন আমাকে ধরলেও ওদের আমি প্রতিষ্ঠা  করে যাব জীবন চলার পথে।

বিনয় শীল

আগমনী রূপ-নালিশ-আবেদন-আনন্দ
                                                
আসিবে জানি মা শারদ লগনে
তব আগমনী গায় মলয় গগনে
ভেদী শুভ্র কুজ্ঝটিকা
পদ্ম-কাশ-শেফালিকা
সৌরভ ছড়ায় সকল দিকে।।
         আজ আবার তাহা মানসপটে উঁকি দিলো বুঝি। শরৎ আসিয়াছে। মানব হৃদয়ের পরতে পরতে অনাগত আনন্দময়ীর রক্তরাগ রঞ্জিত পদচিহ্ন ফুটিয়া উঠিতেছে। আহাঃ ! প্রকৃতিতে আজ কি আনন্দের প্লাবন। দিকে দিকে কাহার অপূর্ব রূপমাধুরীর অকৃত্রিম বিকাশ। ধান্য ক্ষেত্রের কচি কোমল ঘন সবুজ ডগা গুলিও, কোন ত্রিলোক বিস্তারিনী রূপসীর মলয় তরঙ্গায়িত অঞ্চলের পরশে পুলক প্রকাশ করিতেছে। দিবাকর মহোল্লাসে স্বীয় কিরণ মালায় কাহার আসন উদ্ভাসনে সদা ব্যস্ত। ঐ দেখো, দিগন্ত বিস্তৃত নীল গগনে শুভ্র মেঘপুঞ্জের স্মিত হাস্যে আনাগোনা। টুনটুনি, খঞ্জনি, দোয়েলা, কোয়েলাদের কণ্ঠে কাহার আগমনী সুর বাজিয়া উঠিল। কাহার অঙ্গ-সুবাসে আমোদিত অনিল সোৎসাহে বন-প্রান্তরে ছুটিয়া যাইতেছে। নব মুকুলিত পত্র, নব পাপড়ি প্রসারিত প্রসূন, -কোন দেবাঙ্গিনীর প্রেম পেলবতায় সমাচ্ছন্ন। আকণ্ঠভরা পুষ্করিণীর স্বচ্ছ সলিলে শতদল বিস্তার করিয়া কমল প্রস্ফুটিত। পদ্ম কলিতে আজ কোন গিরি দূহিতার উন্মিলিত নয়নের বিচ্ছুরিত দিব্য আলোর জোয়ারে মৃত্তিকার পৃথ্বিমাতা নব আলোকিতা।

         ওই তো! অরুণরাগে শিশির বিন্দু কনকদ্যূতিতে ঝলমল করা শিউলি ছড়ানো সতেজ শ্যামল তৃণাসন। তাহাতে আজ নিত্য প্রাতে, কোন কল্যানীর চরণ চিহ্ন অনুভূত হইতেছে। আজ কাহার অঙ্গ-জ্যোতির স্বর্ণকণা সাঁঝের আলোকে ছড়াইয়া পড়িল। কে বা কাহারা অমানিশার আকাশ ভরা প্রোজ্জ্বল তারকায় কোন মঙ্গলময়ীর জন্য বরণ ডালা সজ্জিত করিয়া রাখিয়াছে।কিসের নিমিত্ত শরৎ বিধুর অধর চ্যুত কোমল অমৃত জ্যোতির হিল্লোল-কল্লোলে ত্রিলোক প্লাবিত।ভ্রমরের গুঞ্জনে, শৈলবক্ষ-বিগলিতা নির্ঝরিণীর গানে গানে, কোন পরমা নন্দিনীর নূপুর-নিক্বনে দিঙমণ্ডল পরিব্যপ্ত। আজ এতো আনন্দ হইতেছে কেন ? কাহাকে লইয়া প্রকৃতির কোলে উল্লাসের এতো আয়োজন ?

          অকস্মাৎ দেখিলাম, কনক লতার ন্যায় এক বালিকা বামহস্তে পুষ্পপাত্র ধারণ পূর্বক পুষ্পচয়ণ মানসে শিউলি তলে বিরাজিতা। তাহার আলতা রাঙ্গা তুলতুলে পদযুগল শিশির জলে সিক্ত। পষ্পরেণু গন্ধে ভরা শীতল সমীরণ বালিকার অঙ্গ পরশিয়া কৃতার্থ বোধ করিতেছে। সদ্য প্রস্ফুটিতা কুসুমের ন্যায় তাহার অনিন্দ্য-সুন্দর বদনোপরি তরুণ তপনের সুচিক্কণ নবীন রশ্মিচ্ছটা ক্রীড়া করিতেছে। নিশীথ ভঞ্জনকারি বিহঙ্গকূলের আনন্দ কলরবে চতুর্দিক মুখরিত। দিগন্তমুক্ত প্রান্তর থেকে শ্যামল অরণ্যানী অবধি নবালোকাচ্ছাদনে এক অব্যাক্ত প্রেরণায় সঞ্জীবিত। সর্বত্রই যেন মঙ্গল মূরতি উৎকীর্ণ। বালিকার মনে কি জাগিল জানিনা, কিন্তু বোধ করি সে পুষ্পচয়ণ বিস্মৃত হইয়াছে। 

           বিশ্বশিল্পীর অতুলন শিল্প-কীর্তিস্বরূপ তাঁহার দুই নয়নে আনন্দাশ্রু বিগলিত দেখিতে পাইলাম। বহুবিধ ভঙ্গীতে সে তৃপ্ত নয়নে দীপ্তি ভরা প্রকৃতির শোভা অবলোকন করিতেছে। জগতের সকল সৌন্দর্য-খচিত, সেই বালিকার ঈষৎ হাস্যরঞ্জিত ওষ্ঠাধরের মধ্যবর্তী সুন্দর দন্তপঙক্তির অগ্রভাগ হইতে রজতঃদ্যূতি বিকীর্ণমান। কোন ধন্য মেনকা মাতা স্বহস্তে কন্যার গভীর কৃষ্ণ কুন্তলে সস্নেহে বনপুষ্প গাঁথিয়া দিয়া, পশ্চাতে এহেন কন্যারত্নের গমনানন্দ উপভোগে মুগ্ধ হইয়াছেন। সবিস্ময়ে লক্ষ্য করিলাম, হঠাৎ বালিকা মৃদুমন্দ ভাবে স্বর্ণতনু আন্দোলন পূর্বক সুমিষ্ট কণ্ঠে গাহিয়া উঠিল-

 শরৎ তোমায় এমন করে 
কে সাজালো।
তোমার মোহন সুরে বাঁশি 
কে বাজালো।।
শিউলি তোমার চরণ তলে 
কেন হাসে।
তোমার ভোরের হাওয়ায় 
ফুলের গন্ধ ভাসে।।
অঙ্গে তোমার আঁচল কাহার
হাওয়ায় লুটে।
কাশের বনে সবুজ ধানে
মাথা কুটে।।
কানন কূলে হাজার ফুলে
কাহার হাসি।
তোমার শোভার তরে নয়ন
হয় পিয়াসী।।
পুষ্পরাণী বুকে তোমার 
ফুটছে কেন।
তাই না দেখে উন্মাদিনী
পৃথ্বি যেন ।।
জানি জানি তুমি কেন
পাগলপারা।
কি আনন্দে তুমি আজি
আত্মহারা ।।
যার ছোঁয়াতে নাচলো তোমার
হৃদয়পরত্।
সেই আমাকে পেয়ে খুশী
তাই না শরৎ ?

            সেই "আমাকে" ! তবে কি জগজ্জননী আনন্দময়ী ভগবতী দূর্গা বালিকা রূপে অবতীর্ণা? যখন বহু অনুসন্ধানে ব্যার্থ পিপাসিত মৃগ শাবক জননীর প্রতি দৃষ্টি গোচর হওয়া মাত্রই, যেমন করিয়া পরমানন্দে গ্রীবা প্রসারণ পূর্বক দীর্ঘলম্ফনে জননীর স্তনামৃত পান মানসে দ্রুত ছুটিয়া চলে, সেই রূপ বালিকা রূপী মঙ্গলময়ীর চরণে লুটিয়া পড়িবার নিমিত্ত ধাবিত হইয়াছিলাম। কিন্তু দেখিলাম, বালিকা হস্তের পুষ্পপাত্রখানি নিম্নে রাখিয়া, ছায়া মাখা পুষ্পাকীর্ণ বন-বিথীকায় অন্তর্হিতা হইলেন। হয়তো বা গিরি রাজের স্নেহস্বর শুনিয়া, নয়তো বা সোনার দুলালী সর্বমঙ্গলার বিলম্ব দেখিয়া, উদ্বিগ্না মা মেনকার  মমতাপ্লুত কণ্ঠের সুগভীর আহ্বান শ্রবণ করিয়া বালিকা জননীসংকাশে গমন করিয়াছে।

            বালিকা কর্তৃক পরিত্যক্ত পুষ্পপাত্রখানি পরম যত্নসহকারে নিশিতে পতিত শেফালিকা সমেত নানাবিধ বনকুসুমে পূর্ণ করতঃ মায়ের চরনোদ্দেশ্যে নিবেদন পূর্বক মাকে বলিতে লাগিলাম-   *হে জগজ্জননী,* ভক্তিহীনের প্রণাম গ্রহণ করো মা। মাগো, তুমি আজ যতই প্রসূনপাত্র হস্তে ধরিয়া বিস্ময়ে হতবাক হওনা কেন, -এ শুধু তোমার রূপের বৈভব ছাড়া তো আর কিছুই নহে়। ভূমানন্দের অপূর্ব প্রেরণায়- 'আপনি নাচো, আপনি গাহো, আপনি দাও মা করতালি' -এই উদ্দাম ছন্দে গা ভাসিয়ে দিলে চলিবে কেন মা? তুমি তো জানো, এ পৃথিবী আবার দৈত্য-দানবে পরিপূর্ণ হইয়াছে। ওই শুনো তোমার ভক্তজনের ক্রন্দনধ্বনি। আজ তোমার সমীপে সবিস্তারে বলিবো মা। দেশের তৃণমমূলস্তর পর্যন্ত অসুরদের দাপাদাপি ও উৎকট উল্লাসে গগন পূর্ণ হইয়াছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, খাদ্য-সংভরন, সাধারণ প্রসাশন হইতে সমাজ ব্যাবস্থা প্রভৃতিতে রাক্ষস-খোক্কসরা জাঁকিয়া বসিয়াছে। সাধু, মহাত্মা, ভক্ত ইত্যাদি নামেও ভণ্ডতার একশেষ হইয়াছে। সর্বত্রই রাজনীতি নামক বিষাক্ত বায়ুর খলপ্রবাহ। প্রকৃত কর্তব্য কর্মে সীমাহীন ফাঁকি অথচ অন্যায় অধিকার আদায়ের জন্য দানবদের কি উশৃঙ্খলতা, -তা একবার নিজের চোখে দেখে যাও মা। *হে দূর্গতিনাশিনী,* আবার তোমার অস্ত্র ধারণের সময় হইয়াছে। ওই দেখো মা, দেশের শান্ত শ্যামল বনভূমিও নিরাপদ নহে। দানবরা গ্রাম, শহর,নগর,বন্দর সহ সুন্দর বনাঞ্চল গুলিরও দখল লইয়াছে। সেখানে আর শ্রুতিমধুর বিহঙ্গকণ্ঠের কলরব নাই। আছে মনুষ্য রূপী জানোয়ারের অবাধ বিচরণ তৎসঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্রের ভয়ঙ্কর গর্জন। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এরা সাঙ্ঘাতিক ভাবে কেবল বাড়িয়াই চলিয়াছে। নারীদেহ গুলো মৃত বা জীবিত হোক, শিশু বা বৃদ্ধা হোক, কিশোরী বা যুবতী হোক ললুপতার হাত থেকে যেন নিস্তার নাই। হানাহানি, রাহাজানি, খুন, জখম, ভদ্রবেশী চৌর্যবৃত্তি এবং কপটতার জমাট রাজত্ব দেখিতে পাইতেছি। একদিকে যেমন যুবসমাজে পোশাকের বাড়াবাড়ি তেমনি অপরদিকে যুবতীদিগের মধ্যে যেন পোষাকের হ্রস্বতার প্রতিযোগিতা শুরু হইয়া গিয়াছে। দিকে দিকে অশুভ শক্তির উল্লম্ফন ও নির্লজ্জতার ছড়াছড়ি। শুচিতা, সত্যবাদীতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদির মতো দৈবীসম্পদ সমূহ আজ যেন বিদ্রুপের বিষয়। তথাকথিত আধুনিকতার নামে কদর্য ও উন্মুক্ত যৌনতা করাল দংষ্ট্রায় মুখ ব্যাদান করতঃ সুকুমার মতি বালক বালিকাদেরও মস্তককে চর্বন করিয়া নিঃশেষ করিতেছে। *হে বরদে,* আজ তুমি ছাড়া সর্বনাশা লম্পট, প্রতারক, স্বার্থান্ধ, গা-জোয়ারি, পিশাচ, পাষণ্ড এবং রাজনৈতিক ধ্বজাধারী রাক্ষসদের বিজয়যাত্রা কে রুখিবে? ওই দৈত্যকূলোদ্ভব দুষ্টু চিন্তা, লোভ, লালসা এবম্প্রকার আরও অগণিত অশুভ বৃত্তিরা দেশের শাসনদণ্ড ও ধনভাণ্ডারের জবরদখল নিয়াছে। এসো এসো মা, সন্তান রক্ষা তরে ঝঞ্জাগতিতে ছুটিয়া আইস। 

         দেখ মা, শহরের মল-মুত্রের পুতিগন্ধে পরিপূর্ণ খানা ডোবা নালার উপরি পাটাতন নির্মান পূর্বক তদুপরি বস্ত্রে, কাষ্ঠে, বাঁশে এবং পরিবেশ দূষণকারী আরও নানাবিধ কৃত্রিম বস্তু দ্বারা নকল মন্দির নির্মাণ করিয়া তাহাতে তোমার মূর্তি বসাইয়া পূজার নামে তোমাকে অপমান করিবার কতো বিচিত্র আয়োজন। কোটি কোটি তোমার জীবন্ত মূরতী দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করিতেছে, অথচ তোমার অপমান যজ্ঞে অগণিত অর্থ ও লক্ষ লক্ষ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিনষ্ট হয়। একে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও আবার গভীর রাতে রঙিন পানীয়ের মাদকতায অনুষ্ঠিত় হয় নরপিশাচ নৃত্য।

           আর বিলম্ব নয় মা। সমর সাজে সজ্জিত হও।  *হে দশপ্রহরণধারিনী,* এ রণক্ষেত্র আজ নীরবে তোমার কঠিন মূরতির ধ্যান করিতেছে। সকল কলুষ মুক্ত কর মা। *হে শুভদে,* তোমার কৃপাদৃষ্টির নয়ন কীরণসম্পাতে এ ঘোর দুর্যোগ কাটাইয়া নবযুগের সূচনা কর মা। সকল অশান্তির কারণ সমূহ সমূলে বিনাশ করতঃ সুহাসে, সত্যে, সমদর্শিতায়, সুন্দরতায় এ নরলোক আবার নন্দনীয় হইয়া উঠুক।

           এত যে অধঃপতন, এত যে তমসা, তবুও কি  দুই-একটি মাতৃপদ-সর্বস্ব ভক্তের পবিত্র গৃহকোণে পরাশক্তি দেবী দুর্গার শারদীয় বোধন হইবে না? ধূপে-দীপে, পুষ্পে-গন্ধে, চারু-চন্দনে, হরিদ্রা আর নবপত্রিকায় দেবীর রাঙা পদে ভক্তের ভক্তি অর্ঘ্য কি নিবেদিত হইবে না? নিশ্চয়ই হইবে। এতো তমিস্রা সত্ত্বেও শারদোৎসবে দেবীর অক্ষয় মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হইবে। তখন আনন্দময়ীর আগমনে কতো অপাপবিদ্ধ বালক-বালিকার চোখে মুখে আনন্দধারার ফোয়ারা উঠিবে। আমিও সেই আনন্দোৎফুল্ল বালক-বালিকাদের কণ্ঠে গাহিতে চাই-

আশ্বিন আসে ওই 
ভাদ্রের পর।
দূর্গার পদধ্বনি 
প্রতি ঘর ঘর।।
জননীর হাসিমুখ
স্নেহে ভরা মন।
রত্নচুড়া পরিহিতা
কাজল নয়ন।।
রক্তিম শাড়ি পরা
আলতা রাঙা পা।
পরমা কল্যানী
আমাদের মা।।
দশহাতে দশ অস্ত্র
অতি সমুজ্জ্বল।
সাজানো সুচিক্কণ
কুঞ্চিত কুন্তল।।
মায়ের সাথে আসে
সিংহ পশুরাজ।
শারদীয় মঙ্গলধ্বনি
প্রতি ঘরে আজ।।
গণপতি লক্ষ্মীদেবী
আর সরস্বতী।
ময়ূরের পিঠে আসবে
দেবসেনাপতি।।
অন্যায় রুখতে কার্তিক
ধরিবে অস্ত্র।
গণপতি সিদ্ধি দাতা
প্রণাম সহস্র।।
কৈলাস হতে দূর্গাদেবী
বাপের বাড়ী আসেন।
পিছু পিছু ভোলানাথ
দেখতে ভালোবাসেন।।
বহুদিন পরে মোদের
মাকে পেয়েছি।
তাঁকে পেয়ে দুঃখরাশি
সব ভুলে গেছি।।
ছোট-বড় সবে মোরা
জননীর সনে।
আনন্দের ফোয়ারা
আমাদের মনে।।
আনন্দ দিয়া মা
রচেছেন খেলা।
মাকে নিয়া ক'টা দিন
মিলনের মেলা।।

       

অনুপম রায়

সতেরো বছর পর সতেরো বছর পর কি অবসাদ সেটা ধারণা না থাকাই ভালো। যাদের তুমি রেখে গেছ আমাদের হয়ে, তারা এখন উন্মাদ শহরের এক কোণে বসে শ্বাস নেয়। জ...